ফিমেল ফ্রেন্ডলি পরিবেশ না চেয়ে বরং সংখ্যা বাড়াতে হবে

March 8, 2015

আমি ফেমিনিস্ট নই। আমি একজন সাধারন মানুষ। নারী দিবস কিংবা নারীর অধিকার এই শব্দগুলো কেন জানি আমার গায়ে লাগে। কেন লাগে সেগুলো মন খুলে কারো সাথে সেভাবে বলার সুযোগ হয়নি। কিন্তু বলতে চেয়েও বা লিখতে চেয়েও লেস ইম্পরট্যেন্ট মনে করে নিজে থেকেই অনুৎসাহিত বোধ করে বলা বা লিখা থেকে বিরত থেকেছি। শুধু মনে হয়েছে, নারী দিবস আবার কি? কেন এর অবতারনা? নারী দিবস ব্যাপারটি উদ্ভাবন আদৌ কি আনন্দের কিছু? বরং কেমন যেন মনে হয়,  নারীরা কতটা দুর্বল সেটা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটা আমার একান্তই নিজের ধারনা। ঠিক বেঠিক নিয়ে তর্কাতর্কির মধ্যে যাবার কোন আগ্রহ আমার নেই।

সে যাই হোক। শুরু যখন করেছি,  কিছু কথা বলে বরং হাল্কা হই  :)
আমাদের দেশে অর্ধেক এর’ও বেশী নারী। নারীর অধিকার, সমঅধিকার যাই বলি না কেন সেটার চর্চা এবং শুরুটা করতে হবে আমাদের পরিবার থেকেই। আমাদের পরিবারে এখনও স্বামী, সন্তান, স্বজনরা একজন নারীর উপরই ডিপেনডেন্ট। আর এই ডিপেন্ডেন্সি আমরা নারীরা সাচছন্দে সাগ্রহে মেনে নিয়েছি। সংসারের খুঁটিনাটি সব কিছু ঠিকঠাক মতো হচ্ছে কিনা সেটার প্রতি খেয়াল রাখাটা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব শুধু নয়, একরকম জবাবদিহিতার জালেও আমরা আবদ্ধ।এসবের পাশাপাশি আমাদের মেয়েদের নারীর ক্ষমতায়ন বা সবলম্বি হবার কথা যেভাবে জোড় গলায় বলা হয় সেটার জন্য আমাদের পথটাকে কি মসৃণ করে রাখা হয়েছে? বরং এই অসম্ভবকে সম্ভব কারার কাজটিও নারীদের উপরই বর্তায়।

বাবামায়ের সংসারে থেকে আমরা কটা মেয়ে পারি পড়াশোনা শেষ করে সাবলম্বি কিংবা প্রতিষ্ঠিত হয়ে স্বামীর সংসারে প্রবেশ করতে? বেশিরভাগই পড়াশোনা শেষ না হতেই নতুবা চাকরি করার আগেই বিয়ে হয়ে যায়, তখন বিয়ের পর প্রতিষ্ঠিত বা সাবলম্বি  হবার সিধান্তটি হয়ে যায় একটি যৌথ সিদ্ধান্ত। পরিবারের সবাইকে সন্তুষ্ট করে যদিওবা চাকরি করবার অনুমতি পাওয়া যায়  কিন্তু দিনের পর দিন অনেক প্রেসার নিয়ে চলতে হয়। ঘরে-বাহিরে, অফিসে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে হাজারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয় চাকরিটা করব নাকি ছেড়ে দিব। পরিবারের লোকজন তখন বলে, দেখ যদি সব সামলে করতে পার। এই সব সামলে করতে পারাটার মধ্যে তখন নারীর অধিকার নিরব। ঘরের কাজ সামলানর জন্য নারীর জন্ম, সন্তানের দেখভালতো মাকে ছাড়া অসম্ভব! শ্বশুরবাড়ির মন রক্ষা করে না চললে সে আবার কেমন মেয়ে, তাছাড়া স্বামীরও মন রক্ষা হবে না। আর বাবা বাড়ির লোকজন এর মতামত আবার কি? বিয়ের পর তো তারা অতিথি মাত্র। সুতরাং, নারী তো আর মা দুর্গা নয় যে, দশ হস্তে সবাইকে সমানভাবে সেবা করে নিজের কাজের জায়গায় সেরাটি হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। হয়ত সেজন্যই, নারী দিবসের মতো আরও অনেক কিছু গঠন করে নারীকে ইন্সপায়াড়ড করে রাখা যে দেখ তোমাদের আমরা কত গুরুত্ব দিচ্ছি! কিন্তু প্রতিটি দিবসই যে আমাদের দিবস, আমাদের ছাড়া একদিনও কি চলবে? এত কিছুর বিনিময় তারা একটি নারী দিবস কেন হাজারটা নারী দিবস করেও শোধ করতে পারবে না। ফলে, আমাদের এই পথ চলাকে সহজ আর মসৃণ করতে  হলে আমাদের দীর্ঘ দিনের প্রচলিত এই পারিবারিক কাঠামোটাকে একটু একটু করে পরিবর্তন করতে হবে। আমি মানসিকতার পরিবর্তনের কথা বলছি। মাতৃতান্ত্রিক পরিবার হওয়া সত্ত্বেও অনেক পরিবারে দেখা যায় মেয়ের স্বাধীন চিন্তার অন্তরায় হয়ে দাড়ায় মা। মা হয়ত ভালোর জন্যই চায়, কিন্তু এতে করে চাপিয়ে দেয়া কোন সিদ্ধান্ত মেয়ের জীবনের আকাশ ছোঁয়া কোন স্বপ্ন হয়ত কুড়িতেই ঝরে পরে যায়। এরকম অসংখ্য নজির আমাদের চারপাশেই অহরহ ঘটতে দেখা যায়। বিশাল কোন পরিবর্তন বিশাল ভাবে ঘটা করে সম্ভব নয়। পরিবর্তনের শুরুটা করা উচিৎ শেকরকে অক্ষত রেখে শেকর থেকেই। আমরা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে আগে দেখি পরিবেশটা ফিমেল ফ্রেন্ডলি কিনা। ফিমেল ফ্রেন্ডলি পরিবেশ না চেয়ে বরং সংখ্যা বাড়াতে হবে। সংখ্যায় নারী কর্মি যখন বাড়বে তখন পরিবেশ এমনিতে ফিমেল ফ্রেন্ডলি হয়ে যাবে। যেমন গার্মেন্টস এ ৮০% নারী ফিমেল, তাই সেখানে ফিমেল ফ্রেন্ডলি পরিবেশ নিয়ে কারো মাথা ঘামাতে হয় না। আইটীতে এবং অন্যান্য প্রফেশন এও আমাদের পারসেন্টেজ টা বাড়াতে হবে। সমান ভাগ নারী পুরুষ হলে সেখানে অপকর্ম, দুর্নিতিও বন্ধ হবে।

 

নারীকে আমরা দেবীর আসনে বসাই, ধরণীকে তুলনা করি জননীর সাথে, পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতার ধারক বাহক যে, তাকে আমরা একজন পুর্নাংগ মানুষ হিসেবে মেনে নিতে এখনও সঙ্কোচবোধ করি। আমাদের এত সব আকাশ চুম্বি উপাধি আর সম্মান দিয়ে কি হবে? যখন সামান্য ইভ টিজং এর কারনে আত্মহত্যা করতে হয় ফাহিমা, হালিমার মতো আরও নাম না জানা শত নারীর। যখন ধর্ষনের সময় পুরুষের সামান্য মুহুর্রতের কামনার ভোগের পাত্রী হলেই লাঞ্ছিত হতে হতে একটি মেয়ের জীবনাবসান হয় সামাজিক, পারিবারিক সব দিক থেকে।

আমরা আসলে কিসের অধিকার চাইছি সেটা বুঝতে হবে। নারী হিসেবে কলঙ্ক ঘোচানর স্বীকৃতির নাকি মানুষ হবার স্বীকৃতি?