নারীর নিজস্ব পরিচয় কি ?

September 19, 2013

মেয়েদের আত্মসম্মান বলতে আমরা কি বুঝি? এর সঠিক মুল্যায়ন কিভাবে হচ্ছে বা আদৌ কি হচ্ছে? ঘরে-বাইরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আর স্বীকৃতি আসলে কতটুকু অর্জন করতে তারা পেরেছে বা পারছে? “স্বাধীনতার” পূর্ণ স্বাদ কি আসলেও একটি মেয়ে পায়? সত্যি কি একটি মেয়ে তার ইচ্ছে মতো বাঁচার অধিকারটুকুন আজ পর্যন্ত আমাদের সমাজে অর্জন করতে পেরেছে?

পুতুল খেলতে খেলতে বড় হওয়া ছোট আদরের মেয়েটি এ-কোল ও-কোল করতে করতে এক সময় মাটিতে পা রাখে। পরিবারের গন্ডি থেকে পা বাড়িয়ে ইস্কুল-কলেজ জীবন এ সীমিত পরিসরে ধরাবাধা সামাজিক দায়বদ্ধতার কয়েক’শ চোখের শাসানি সহ্য করে কিশোরী থেকে বিবাহপুযুক্ত কনে হয়ে ওঠে। অতপরঃ বিবাহ নামক আরেক গন্ডিতে সারাজীবনের জন্য প্রবেশ। নীল কাগজে কজন সাক্ষী সমেত চুক্তিবদ্ধ হয়ে নুতন সাজানো পরিবেষ্টিত গৃহে অচেনা মানুষটির সাথে সারাজীবনের জন্য একসাথে সুখে-দুখে কাটিয়ে দেয়া।

অচেনা পরিবেশে এসে পরদিন থেকেই শুরু হয়ে যায়, শশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ সবাইকে সন্তুষ্ট করার নতুন এক নিরব ইমোশনাল খেলা। বিনিময়ে পায় একটা ঘর, চার বেলা খাবারের নিশ্চয়তা, পোশাক পরিধান ইত্যাদি। আর দিনের পর দিন বুঝিয়ে দেয়া হয় মেয়েরা তাদের বাবার বাড়ির সাথে যত কম যোগাযোগ রাখবে ততই সংসার এ সুখ শান্তি  বজায় থাকবে। ব্যাপারটি অনেকটা এই রকম হাস্যকর যে, তার শেকর উপরে ফেলে নতুন করে এই পরিবারের সব কিছু তাকে রপ্ত করাটাই যেন তার জীবনে একমাত্র লক্ষ্য।

বছর ঘুরতেই সন্তানাদি। পরিপূর্ণ সংসারের দেখভাল করে অনেক শিক্ষিত মেধাবী মেয়ে এক সময় হয়ে যায় সম্পূর্ণ গৃহস্থলী দেখাশোনার একজন সুগৃহিনী, সম্পুর্ণা, লক্ষী বউ বা অসাধারন বৌমা! সব সামলে তবু কখনো স্বামীর এটা সেটা নিয়ে অসন্তুষ্টি, কখনো সন্তানের নানা ব্যাপার নিয়ে, কখনো পরিবারের বাকি সদস্যদের সমস্যা নিয়ে; সবকিছু একসময় নিত্যদিনের একটি ব্যাপার হয়ে দাড়ায়। ছকে বাধা এই ছোট একটিমাত্র জীবনে, আরো যেন ছোট হয়ে আসে তার পৃথিবী।

অনেক নারীবাদী আছেন যারা কখনো গতানুগতিক এই বিয়ে প্রথা নিয়ে কথা বলে না। সেখানেও তাদের পুরুষেরা চায় বউ একটা কিছু করে সন্তুষ্ট থাকুক। ভেজালের দরকার কি? আর সোশাল স্টেটাস তো বাড়ছেই পাশাপাশি। দু’চারটে পুরুষকে নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ উদাহরণ টেনে কি অধিকার আদায় করা যায়? আসলে সমস্যা বিয়ে প্রথা নিয়ে নয়। সমস্যা হচ্ছে নারীর পরিচয় নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হবার। পিতৃগৃহকেই যে আপন গৃহ বলে জানতে জানতে বড় হয় একদিনে হঠাত সে ধারনা বদলে যাওয়া বা সম্পুর্ন নতুন পরিবেশে এই যে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য হিমশিম খাওয়া সেটা মনবিকতার দিক থেকেও কতখানি চাপের তা নিরপেক্ষভাবে অনুধাবন করতে পারাটা খুব কঠিন কিছু নয়।

অধিকার বিষয়টি আসলে কি সেটা সম্পর্কে আমাদের কখনো স্পস্ট ধারনা দেয়া হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের এই শব্দটি থেকে দুরুত্ত বজায় রাখার জন্য বরাবরই ঘুরিয়ে পেচিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু মেয়েরা যে কতটা শক্তিশালী সেটা সবাই ঠিক জানে। আর জানে বিধায় যুগের পর যুগ তাদের কখনো দেবীর আসনে, কখনো পণ্যের মডেল বা নানাভাবে প্রলুব্ধ করে মিসগাইড করে রাখা হয়েছে। নারী ছাড়া সব অচল। একঘেয়েমি একই তরকারি প্রতিদিন রান্না করতে কার ভালো লাগে? এই সমাজ ব্যাবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। যে সামাজিক রীতি বা আচারের কারনে নারীরা কখনোই একজন পুর্মানাংগ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে পারছে না। সঠিক অধিকার অর্জনের মাধ্যমে মানুষ হিসেবে মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল আর আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শিখুবে এই আমাদের প্রত্যাশা।

নিলীম – ২০১১-১২-১২