স্টার্টআপ কনসেপ্ট এবং আমাদের অবস্থান

January 1, 2015

স্টার্টআপ কি?

যখন একটি কোম্পানি বাজারে নতুন এবং মৌলিক কোন সেবা কিংবা কোন প্রোডাক্ট নিয়ে ব্যবসা শুরু করে তখন তাকে আমরা স্টার্টআপ বলে থাকি। একটি স্টার্টআপে সাধারনত একজন বা কয়েকজন মিলে ইনভেস্ট করে ।স্টার্টআপের উদ্দেশ্য হচ্ছে মৌলিক একটি উদ্যোগকে ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় করে করে তোলা। একসময় এর উপর্জুপুরি ক্রমবর্ধমান গ্রোথ এর উপর নির্ভর করে কোন জায়ান্ট এর কাছে মোটা অঙ্কে বিক্রি হয়ে যাওয়া। অনেকটা “মুখের মধ্যে টোপ নিয়ে বড়শীর জন্য অপেক্ষা করার মতো।

কিছু উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হতে পারি। আমরা জানি ২০০৬ সালে গুগল ইউটিউবকে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছিল। ইন্টারনেট জগতে ইউটিউবের জন্ম হয়েছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ সালে। তিনজন ইয়াং এন্ট্রপ্রনার চাঁদ হারলি, স্টিভ চেন এবং জায়েদ করিম মিলে ইউটিউব প্রতিষ্ঠা করে।

অন্যান্য অনেক টেকনোলজির মতই এঞ্জেল ফান্ড এর সহায়তায় ইউটিউব খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। স্টার্টআপ হিসেবে ইউটিউবের এত অল্প সময়ে বেড়ে উঠা এবং মোটা অঙ্কে গুগলের কাছে একুয়ার হয়ে যাওয়াটা সে সময়ে ওয়েব এর জগতে বেশ সারা ফেলে দিয়েছিল। এযাবত কালে এখনও সবচেয়ে লাভজনক এবং সফল স্টার্টআপ হিসেবে ইউটিউবের অবস্থান। এতো গেল ইউটিউব এর কথা। এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। যেমন পেপাল এর মতো একটি গরিলাকে ই-বে কিনে নিয়েছে। ফেসবুক কিনে নিয়েছে ইন্সটাগ্রামকেটুইটার কিনেছে টুইটডেক। এওএল কিনেছে নেটস্কেপ। মাইক্রোসফট কিনেছে হটমেইল। ইয়াহু কিনেছে হটজবস। এরকম আরও অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে হ্যা, এদের মধ্যে বেশীরভাগই কিন্তু মুখে বড়শির টোপ নিয়ে ব্যাবসা শুরু করেনি। এদের ব্যাবসার মাষ্টার প্ল্যান ছিল অনেক বেশী স্ট্রং, অরগানাইজড এবং ইউজারদের সার্ভিস দেয়া নিয়ে আপোষহীন।

স্টার্টআপ এবং আমাদের অবস্থান

২০১২ সাল থেকে স্টার্টআপ এর হাওয়া লেগেছে বাংলাদেশেও। বিদেশি কোম্পানিগুলো এবং এঞ্জেল ইনভেস্টররা ইনভেস্ট করার জন্য আগ্রহী হচ্ছে। দেশে স্টার্টআপ কোম্পানিও দিনকে দিন বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় বৃহৎ আইডিয়া নিয়ে কোম্পানিগুলো স্টার্টআপ ধারনাটাকে সেরকম সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত যুগান্তকারী কোন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারছে না।

এর কারন কি? বেশীরভাগ স্টার্টআপ রিয়ালিস্টিক কন্সেপ্ট এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা ছাড়া হুজুগের উপর ব্যাবসা শুরু করে দিচ্ছে। মৌলিক পরিকল্পিত প্ল্যান এবং পর্যাপ্ত রিসার্চ ছাড়া স্টার্টাপ কোম্পানি করছে ফলে প্রোডাক্ট বা সার্ভিসটি নিয়ে বেশিদূর পৌছতে পারছে না। যেমন, এরকম অনেককেই দেখছি যারা একটি ইকমার্স সাইট বানিয়ে বলছে স্টার্টআপ। কিন্তু বাজারে একই সারিতে একইরকম দেখতে অনেকগুলো সাইট আছে যাদের নিজস্ব উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ফিচার ছাড়া আলাদা তেমন কোন বৈশিষ্ট নেই। আবার একটি মোবাইল অ্যাপ বানিয়ে সেটাকে স্টার্টআপ বলছে, দেখা গেল সেটা খুবই সাদামাটা আট দশটা অ্যাপ এর মতই একটি স্ট্যাটিক অ্যাপ। অনেকের ধারনা মোটামুটি একটা কিছু দাঁর করিয়ে মুখে টোপ নিয়ে বসে পড়বে আর ইনভেস্টর এসে মোটা অঙ্কে কিনে নেবে।

তাহলে ঘটনাটা কি দাঁড়াচ্ছে? কোন ভিশন ছাড়াই স্টার্টআপ এর কনসেপ্ট নিয়ে সবাই কতদিন সাস্টেইন করতে পারবে? ইনভেস্ট তো কমবেশী হচ্ছে সেটার যদি গ্রোথ না হয়, কোন ধরনের লাভজনক সম্ভাবনা না থাকে তাহলে কেন কেউ উৎসাহী হবে প্রোডাক্টটি কিনতে? কিংবা কেন স্টার্টআপ কোম্পানিতে ইনভেস্ট করবে?
স্টার্টআপ নিয়ে যারা সত্যি আগ্রহী, তাদের উচিৎ শুরু করার আগে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাপক পরিমান রিসার্চ করা। মার্কেট যাচাই করে নিজের প্রোডাক্ট সম্পর্কে আগে ভালো করে বোঝা। এর সম্ভাবনা, কনজুমারদের দৃষ্টিকোণ থেকে সকল পজিটিভ ও নেগেটিভ দিকগুলো ক্ষতিয়ে দেখা। ডুপ্লিকেট বা হুবুহু কপি না করে মৌলিক এবং কার্জকরী কিনা সেদিকটা আগে ভালো করে নিশ্চিত হওয়া।


সহজ কিছু টিপস

সিলিকন ভ্যালিতে যাবার স্বপ্ন নিয়ে তরিঘরি করে স্টার্টআপ শুরু করে দিলেই চলবে না। এর এন্ডাপ ফিউচার নিয়েও ভাবতে হবে। একটি স্টার্টআপ শুরু হতে পারে ছাদের চিলেকোঠা কিংবা গ্যারেজ থেকে। কিন্তু সেটার টপ বেস্ট পজিশনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ প্রক্রিয়াটা আগেই ঠিক করে নিতে হবে। কোন কিছু শুরু করার আগে প্রোডাক্টটি সম্পর্কে নিজের কাছে পরিষ্কার ধারনা থাকতে হবে। কেন প্রোডাক্টটি বেস্ট এবং কিভাবে এর গ্রোথ হবে সেটার সুস্পষ্ট একটা রোডম্যাপ দাড় করাতে হবে। প্রোডাক্ট বা সার্ভিস এর মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট থাকতে হবে যাতে করে সহজেই বোঝা যায় সে বাকিদের থেকে আলাদা। ব্যাপক পরিমাণ রিসার্চ এর মানসিকতা থাকতে হবে। বিশ্বের বড় বড় স্টার্টআপদের সম্পর্কে জানতে হব। তাদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি তথ্য সম্পর্কে যতদূর সম্ভব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানার চেষ্টা করতে হবে। আবশ্যই কপি করার জন্য নয় বরং প্ল্যানিং এবং ইন্সপিরিশন নেবার জন্য। তবে হ্যা, সব সময় সব স্টার্টআপই যে বিক্রি হয়ে যাবার জন্য করতে হবে এমন কোন কথা নেই। নিজের ভালো ইন্সফ্রাক্টাচার, স্কিল্ড ম্যান পাওয়ার, মোটামুটি বছরখানেক চালানোর মতো ইনভেস্টমেন্ট থাকলে সেটা নিজেরাও করা যেতে পারে। আর যদি বিক্রি করে দেবার চিন্তা থাকে তাহলে টার্গেট রাখা উচিৎ এমন প্রোডাক্ট বানাতে হবে যাতে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট এর মতো কোম্পানিগুলো কেনার জন্য আগ্রহী হয়। তাহলেই সম্ভব যুগান্তকারী কিছু করে দেখানোর।

– নিলীম আহসান, ২০১৫