ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে যত বিভ্রান্তি!

November 10, 2014

ফ্রিল্যান্সিং” শব্দটি  একটি বহুল আলোচিত শব্দ। পত্র-পত্রিকায়, টিভিতে, নিউজ সব জায়গাতেই এর ব্যাপক কাটতি। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে দু’চার কথা লিখব। বিশেষ করে প্রথম আলোতে আমার ফিচার একটি নিউজ প্রকাশিত হওয়ার পর যে এক্সপেরিয়েন্সটি হয়েছিল সেটা সবার সাথে শেয়ার করা উচিৎ। নিউজটি ছিল আমার কাজের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বায়োগ্রাফিমূলক। নিউজটি পড়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই ফোন করেছিল। শুভাকাঙ্ক্ষীদের উইশ এর পাশাপাশি আরও কিছু বিচিত্র এনকয়ারি এসেছিল। সেগুলোর কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম –

১. ” হ্যালো – আপা আমি লালমনিরহাট থেকে বলছি, আপনার নিউজটা পড়ে আমি খুব উৎসাহ বোধ করছি, আমি ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চাই। কিভাবে শিখব?”
২. “হ্যালো –  আপা  আমিও আপনার মতো নিজেকে একজন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, কিভাবে ফ্রিল্যান্সিং শিখব যদি একটু গাইড করতেন।”
৩. “হ্যালো – আপা আমি রাজশাহী থেকে বলছি, আমি ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চাই, আপনি কি অনলাইনে শেখান?”
৪. “হ্যালো – আপা ফ্রিল্যান্সিং শিখতে কত দিন লাগে?”
৫. “হ্যালো- আপা ফ্রিল্যান্সিং শিখে আমি মাসে কত টাকা পর্জন্ত আয় করতে পারব?”
৬. “হ্যালো – আপা আমার দুই মেয়ে এস.এস.সি এবং এইচ.এস.সি দিয়েছে। ওরা তাদের পড়াশনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চায়, আপনার প্রতিষ্ঠানটি কোথায়? কিভাবে আমরা সহায়তা পেতে পারি আপনার কাছ থেকে?”
৭. “হ্যালো –  আপা ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নিতে চাই, আপানার পরামর্শ চাচ্ছি।”
৮. “হ্যালো – আপা ফ্রিল্যান্সিং শিখতে কত টাকা লাগবে?”
৯.-“হ্যালো – আপা আমি আর্টস ব্যাকগ্রাউন্ড এর একজন ছাত্রী, আমি কি ফ্রিল্যান্সিং শিখতে পারব?”
১০.-“হ্যালো- আপা আমি পেশায় একজন ব্যাবসায়ী, বয়স একটু বেশি কিন্তু আমি মনে করি বয়স শেখার জন্য কোন ব্যাপার না, আপনার নিউজটা পড়ে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি ফ্রিল্যান্সিং শিখে অবসর সময়ে কিছু এক্সট্রা ইঙ্কাম করতে চাই, কোথায় শিখব, কত দিন লাগবে?”

প্রথমেই বলে নেই, আমার নিউজটির কোথাও বলা ছিল না আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। আমার ক্যারিয়ার এর শুরুটা হয়েছিল ডিজাইন দিয়ে। কিছুদিন আমি আউটসোর্সিং করেছিলাম কিন্তু সেগুলো ছিল বিভিন্ন ওয়েব প্রজেক্ট, অনলাইন মার্কেটিং আর ডিজাইন ভিত্তিক। কিন্তু পাঠকরা ধরে নিয়েছে, আমি একজন ফ্রিল্যান্সার। ধরে নিবেই বা নেবে না কেন? এই শব্দের মানেটা তারা যতটুকু বুঝেছে ততটুকুই বলেছে। আমাদের ইংরেজী শব্দগুলো বাংলায় ঢুকে পড়ে, কিন্তু একেকজনের কাছে একেক রকম মানে নিয়ে ঢুকে। খন্ডাবার কেউ নেই । দিব্যি মুখের সামনে ভুল বলে যায় কিন্তু বুঝেও ভুলটি ধরিয়ে দেই না আমরা।

ফিরে আসি মুল প্রসঙ্গে। ফ্রিল্যান্সিং অর্থ – স্বাধীন পেশা। আমরা কারো অধীনে না থেকে বা ৯টা ৫টা অফিস না করে যখন স্বাধীনভাবে কোন নির্দিষ্ট স্কিল বা দক্ষতার উপর ভিত্তি করে কোন কাজ করি তখন সেটাকে ফ্রিল্যান্সিং করা বলি। ফ্রিল্যান্সিং একা কোন সাব্জেক্ট  নয়। ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে অবশ্যই কোন বিষয়ের উপর দক্ষ হতে হবে। যেমন আইটি তে কোন সেক্টরে আপনার যদি বিশেষ দক্ষতা থাকে, আপনিও ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন। যেমন- ওয়েব ডিজাইনার, গ্রাফিক ডিজাইনার, প্রোগামার, অনালাইন মার্কেটার, কন্টেন্ট রাইটার, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর ইত্যাদি। এছাড়াও টিচিং, ফটোগ্রাফি, কন্সাল্ট্যান্সি, আরকিট্যাকচার ইত্যাদি ফিল্ডেও ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। দৈনিক, পাক্ষিক, মাসিক, বাৎসরিক ভিত্তিতে কন্ট্রাক এর মাধ্যমেও অনেকে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে।। ফ্রিল্যান্সিং দেশেও করা যেতে হতে পারে আবার বিদেশেও করা যেতে পারে। আর যখন আমরা দেশে বা বিদেশে কোন চুক্তির মাধ্যমে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং কাজগুলো করি তখন তাকে বলে আউটসোরসিং

আউটসোর্সিং কি?
সাধারনভাবে বলতে গেলে, যখন একটি দেশ অন্য একটি দেশ থেকে কোন কাজ করিয়ে নেয় সেটাকে আউটসোরসিং বলে। যেমন যদি বিদেশের কোন কোম্পানি বা ব্যাক্তি তাদের কাজগুলো আমাদের দেশের কোন ব্যাক্তি বা কোম্পানিকে দিয়ে করিয়ে নেয় সেটাকে আমরা আউটসোরস বলতে পারি।
আউটসোরসিং করার উদ্দেশ্য কি? প্রথমত, স্বল্প মুল্যে কাজ করে নেবার সুবিধার জন্যই উন্নত দেশগুলো নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোতে আউটসোর্স করে। যেমন গার্মেন্টস শিল্প, কুটির শিল্প, সফটওয়্যার শিল্প ইত্যাদি। আমাদের দেশে শ্রমিকে্র পারশ্রমিক কম বলে উন্নত দেশগুলো আমাদের দেশ থেকে অনেক কমের মধ্যে কাজ করিয়ে নিতে পারে।

সুতরাং, বাহিরের দেশের সাথে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে হলে আপ্নাকে কোন না কোন বিষয়ের উপর অবশ্যই দক্ষ হতে হবে। যদি আইটিতে কাজ করতে চান, তাহলে ডিজাইন, প্রোগ্রামিং, ডেটা এন্ট্রি, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি যেকোন একটি সেক্টরে আগে কাজের উপযুক্ত হয়ে তারপর কাজে নামুন। ক্যারিয়ার পাথটা আগে ঠিক করে নিন আপানার কি ভালো লাগে সেটা বুঝে। আপনার কাছে সহজ এবং সাচ্ছন্দের মনে হয় এরকম বিষয়কে আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন তারপর সেটার উপর দক্ষতা অর্জন করুন। ওয়েবে শেখা এবং জানাটাও এখন হাতের কাছে। তাই অন্যের কথায় কান না দিয়ে ওয়েবে আপনার যা জিজ্ঞাসা সেটা খুঁজে বের করে নিজে থেকে জানার চেষ্টা করুন।

ভুল কিছু জেনে থাকলে, সেটা শুধরানোর দায়িত্ব আপনার নিজের। যে শব্দটা জানেন সেটাই যদি ভুল হয়, তাহলে শেখাটাও ভুল হবে। আর আমাদের দেশে, এরকম মানুষের সংখ্যাও কম নয় যারা ভুল জানা মানুষগুলোকে না শুধরিয়ে বরং আরো মিসগাইড করে অসৎ উপায়ে টাকা অর্জন করে। এরা যাতে সে সুযোগ না পায়, সেজন্য সবার আগে আপনাকে সচেতন হতে হবে।

– নিলীম আহসান, ২০১৫